সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

তুমি থেকেও ছিলে না: এক অপূর্ণ ভালোবাসার উপাখ্যান | লেখক: সৈকত প্রসাদ রায়

 

তুমি থেকেও ছিলে না

লেখক: সৈকত প্রসাদ রায়

সন্ধ্যা নামছে। জানালার ওপাশে অলস বাতাসে ওড়ে সাদা পর্দা। ভেতরে নিঃশব্দ এক কামরা ঘরে বসে অরণী একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে পুরনো একটা চিঠির দিকে। হাতের আঙুল ছুঁয়ে ছুঁয়ে পড়ছে পুরনো অক্ষরগুলো—যেন প্রতিটা শব্দে জমে আছে কোনো অতৃপ্ত অভিমান।

“আমি আছি” — চিঠিতে লেখা ছিল।

তবু অরণীর মনে হয়, অনির্বাণ কোনও দিনও আসলে ছিল না।
তাকে ভালোবেসেছিল বটে, ছুঁয়েও দেখেছিল, প্রতিশ্রুতির নরম উষ্ণতায় ভরিয়েছিল শীতল রাতগুলো।
তবু সে ছিল না।

একসাথে ছিল দু’জনে সাতটা বছর। অথচ অরণীর মনে পড়ে না এমন একটা দিন, যেদিন অনির্বাণ পুরোপুরি তার কাছে ছিল। ছিল না অন্তরের গভীরতায়, ছিল না সংলাপে, ছিল না প্রয়োজনের টানাপোড়েনে।

একটা সময়, প্রতিটা সকালে ঘুম ভাঙত অনির্বাণের মেসেজে —
“ঘুম থেকে উঠেছো?”
তারপর ধীরে ধীরে সেসব ঘনত্ব হারাল। “কাজ আছে”, “মিটিং আছে”, “আজ দেখা না হলে হয় না?”, “তোকে নিয়ে একদিন সব ঠিক করব”—এসব অজুহাতে জমা হতে থাকল দূরত্ব।

একটা মানুষ পাশে থেকেও কীভাবে এতটা না-থাকার মতো করে ফুরিয়ে যায় — অরণী বুঝেছিল সেই সময়ে।

ছুটির দিনগুলোতে, সে চুপচাপ অনির্বাণের জন্য অপেক্ষা করত। একটা বার ফোন করলেই তো হতো!
কিন্তু ফোনের ওপাশে কেবল অনুপস্থিতির নিঃশব্দ বেজে উঠত।
সেই নিঃশব্দে জমে থাকত অরণীর হতাশা, কান্না, একরাশ অপমান।
সে বোঝে, ভালোবাসা মানেই দখল নয়। কিন্তু ভালোবাসা যদি একতরফা হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে তার আর অস্তিত্ব কোথায়?

একদিন সাহস করে অরণী জিজ্ঞেস করেছিল —
“তুমি আমার পাশে থাকো, অথচ আমার দুঃখে নেই কেন?”

অনির্বাণ শুধু হেসে বলেছিল, “তুমি এত সেনসিটিভ কেন অরণী?”

তাদের সম্পর্কটা কবে যেন একটা নিঃশব্দ চুক্তিতে পরিণত হয়েছিল — যেখানে অরণী কেবল অপেক্ষা করে, আর অনির্বাণ তার অনুপস্থিতিকে ‘ভালোবাসা’র নাম দিয়ে বৈধতা দেয়।

পুজোর এক বিকেলে অরণী জিজ্ঞেস করেছিল,
“চলো না আজ দক্ষিণেশ্বর যাই? অনেকদিন কোথাও যাওয়া হয় না।”
অনির্বাণ ফোনে ছিল। কপাল কুঁচকে বলেছিল, “আজ না, ক্লায়েন্ট মিটিং আছে। পরে যাবো।”

সেই “পরে” আর কোনোদিন এল না।

অরণী বুঝেছিল, এক সময়ের যত্ন কেমন করে দায়িত্বে পরিণত হয়, আর দায়িত্ব ধীরে ধীরে বিরক্তির রূপ নেয়।
তবু সে ছাড়তে পারেনি।
ভেবেছিল, হয়তো একদিন বদলাবে সব।
ভেবেছিল, ভালোবাসা একতরফা হলেও টিকে থাকে কিছু আশ্বাসে।

কিন্তু একটা সম্পর্ক তো কেবল স্মৃতির উপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না।
ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন যখন কেবল একজনই দেখে, তখন অপরজন সেখানে শুধুই ছায়া হয়ে থাকে।

অবশেষে, একদিন অরণী বলেছিল —
“চলো না, এবার শেষ করি। আমি আর পারছি না।
তুমি থেকেও নেই। এই অভাবের সঙ্গী হয়ে আর বাঁচতে পারছি না আমি।”

অনির্বাণ নিশ্চুপ ছিল। কেবল বলেছিল —
“তোমার ইচ্ছা। আমিও ক্লান্ত।”

এটাই শেষ কথা।

তারপর কেটে গেছে তিন বছর।
অরণী এখন একা থাকে। নিজের মতো করেই বাঁচে। বই পড়ে, গান শুনে, দুপুরে গাছের ছায়ায় বসে থাকে।
তবু কোনো কোনো রাতে হঠাৎ করে পুরনো ফোল্ডারে একটা চিঠি পড়ে চোখে আসে —
“আমি আছি, জানো তো?”

তখন বুকের ভেতরটা হঠাৎ করে হাহাকার করে ওঠে।
সে ভাবে, একজন মানুষ পাশে থেকেও কীভাবে না-থাকার মতো করে চলে যায়…

তুমি থেকেও ছিলে না —
এই সত্যিটা অরণীর হৃদয়ে খোদাই হয়ে গেছে।
ভালোবাসা শেষে একটা শূন্যতা থেকে যায়,
যা কারও উপস্থিতির থেকেও গভীর।

সমাপ্ত


একাকীত্ব ,সম্পর্কের টানাপোড়েন,

  • নিঃশব্দ বিচ্ছেদ

  • অপেক্ষা

  • মান অভিমান

  • স্মৃতিচারণ

    • BanglaGolpo

    • BengaliLiterature

    • ShortStory

    • SaikatPrasadRoy

    • BanglaSahitya

    • LoveAndLoss

    • BengaliWriter


  • মন্তব্যসমূহ

    এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

    বিদায় বেলার ফুটবল: এক টুকরো হাহাকার ও বন্ধুত্বের গল্প

     জীবন আসলে এক বহমান নদী, যেখানে প্রতিটি বাঁকে আমাদের কিছু পুরনো অভ্যাস আর প্রিয় মানুষকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যেতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই চারটে বছর—যাকে আমরা একসময় ফুরিয়ে যাবে না বলে ভাবতাম—আজ তার সমাবর্তন শেষে বিদায় জানানোর লগ্ন। রাতুল আর সায়নের সেই শেষ বিকেলের হোস্টেল রুমের নিঃশব্দ মুহূর্তগুলো কি কেবলই বিচ্ছেদ? নাকি এক পুরনো তালি দেওয়া ফুটবলের আবরণে ধরা থাকা একগুচ্ছ অমূল্য স্মৃতি? আমার লেখা অনুগল্প 'বিদায় বেলার ফুটবল' সম্প্রতি 'অনুগল্পের আসর' -এ পাঠ করা হয়েছে। রানাঘাট থেকে আকাশবাণী পর্যন্ত আমার এই ছোটগল্পের যাত্রার সেই বিশেষ মুহূর্তটি আপনাদের সাথে ভাগ করে নিচ্ছি। নিচে দেওয়া ভিডিওতে শুনুন সেই আবেগের প্রতিধ্বনি। গল্পটি লিখতে গিয়ে আমি অনুভব করেছি যে, প্রকৃত বন্ধুত্ব কখনও দূরত্বে হার মেনে যায় না। এমনকি ধর্মের কোনো দেয়াল বা ভৌগোলিক সীমানাও সেই টানকে ম্লান করতে পারে না। আশা করি, আপনাদেরও এই গল্পটি নিজেদের কোনো প্রিয় বন্ধুর কথা মনে করিয়ে দেবে। #MiniStory, #BengaliLiterature, #Anugalpa, #Ranaghat, #FMGold  , #Bondhutto #সৈকত প্রসাদ রায় অনুগল্প #বিদায় বেলার ফুটবল ছোটগল্প #রাত...

    বিশ্বজননী সারদা মা: শ্রীমা সারদা দেবীকে নিবেদিত একটি ভক্তিপূর্ণ কবিতা

     " অঙ্কুর পত্রিকার ২৫তম সংখ্যায় প্রকাশিত আমার নতুন কবিতা 'বিশ্বজননী' । নারী শক্তির আধার এবং পরম করুণাময়ী শ্রী শ্রী সারদা মা-এর উদ্দেশ্যে আমার এই বিনম্র নিবেদন। জয়রামবাটীর পুণ্যভূমি থেকে শুরু করে আজ প্রতিটি ভক্তের হৃদয়ে মা বিচরণ করছেন শান্তি ও ক্ষমার রূপ ধরে। বছরের শুরুতে মায়ের আশীর্বাদ চেয়ে লেখা এই কবিতাটি আপনাদের কেমন লাগলো তা কমেন্ট করে জানাবেন। মায়ের চরণে আমাদের সকলের প্রণাম। জয় মা সারদা!" Kobitar Naam: Bishwojanani (বিশ্বজননী) Lekhok: Saikat Prasad Roy (সৈকত প্রসাদ রায়) Potrika: Ankur Patrika (অঙ্কর পত্রিকা) Bishoy: Sarada Ma-er Bhaktigiti o Kobita. #SaradaMa  #SriMaSaradaDevi  #BhaktiPoetry  #BengaliPoem  #AnkurPatrika  #বিশ্বজননী  #সৈকত_প্রসাদ_রায়  #সারদামা  #বাংলা_কবিতা #ভক্তিগীতি

    যেখানে শান্তি থাকে (জীবনমুখী ছোটগল্প) | কলমে: সৈকত প্রসাদ রায়

       "সফলতা একধরনের বাহ্যিক প্রাপ্তি, কিন্তু শান্তি হল আত্মার গভীর উপলব্ধি।" বিশাল অট্টালিকা, দামী গাড়ি আর বিদেশের সফর—অর্জুন দত্তর জীবনে কমতি ছিল না কিছুর। তবুও ছাপ্পান্নো বছর বয়সে এসে কেন তাঁর মনে হলো, সাফল্যের ভিড়ে আসল শান্তিটা হারিয়ে গেছে? সাফল্যের চাকচিক্য ছেড়ে শেকড়ের টানে ফিরে যাওয়ার এক অনন্য গল্প: "যেখানে শান্তি থাকে" । আমার ব্লগে গল্পটি প্রকাশিত হয়েছে। পড়ার আমন্ত্রণ রইল। কলমে: সৈকত প্রসাদ রায়। #যেখানে_শান্তি_থাকে #সৈকত_প্রসাদ_রায় #বাংলা_গল্প #জীবনবোধ #শান্তি #BengaliLiterature ✍️ সৈকত প্রসাদ রায় জীবনের সবচেয়ে উঁচু দালানটা শেষমেশ দাঁড়িয়ে থাকলেও, তার ছায়ায় পড়ে থাকা নীরবতা অনেক সময়ই কেউ দেখে না। অর্জুন দত্তর বয়স এখন ছাপ্পান্নো। শহরের সবচেয়ে নামী কনস্ট্রাকশন কোম্পানির মালিক, টাকার হিসেব রাখতে গিয়ে অ্যাকাউন্ট্যান্টরও কপালে ঘাম জমে যায়। বাড়ি, গাড়ি, বিদেশ সফর, পুরস্কার—সবই আছে। না থাকার কিছু নেই। অথচ কিছু একটা যেন নেই—এই কথাটাই বারবার মাথায় ঘোরে। আজ রবিবার। অর্জুন বসে আছেন নিজের বিশাল বাগানে। কফির কাপ হাতে, চোখ কিন্তু দূরের আকাশে। হঠাৎই মনে পড়ে গেল ২২...