"সফলতা একধরনের বাহ্যিক প্রাপ্তি, কিন্তু শান্তি হল আত্মার গভীর উপলব্ধি।"
বিশাল অট্টালিকা, দামী গাড়ি আর বিদেশের সফর—অর্জুন দত্তর জীবনে কমতি ছিল না কিছুর। তবুও ছাপ্পান্নো বছর বয়সে এসে কেন তাঁর মনে হলো, সাফল্যের ভিড়ে আসল শান্তিটা হারিয়ে গেছে?
সাফল্যের চাকচিক্য ছেড়ে শেকড়ের টানে ফিরে যাওয়ার এক অনন্য গল্প: "যেখানে শান্তি থাকে"।
আমার ব্লগে গল্পটি প্রকাশিত হয়েছে। পড়ার আমন্ত্রণ রইল। কলমে: সৈকত প্রসাদ রায়।
#যেখানে_শান্তি_থাকে #সৈকত_প্রসাদ_রায় #বাংলা_গল্প #জীবনবোধ #শান্তি #BengaliLiterature
✍️ সৈকত প্রসাদ রায়
জীবনের সবচেয়ে উঁচু দালানটা শেষমেশ দাঁড়িয়ে থাকলেও, তার ছায়ায় পড়ে থাকা নীরবতা অনেক সময়ই কেউ দেখে না।
অর্জুন দত্তর বয়স এখন ছাপ্পান্নো। শহরের সবচেয়ে নামী কনস্ট্রাকশন কোম্পানির মালিক, টাকার হিসেব রাখতে গিয়ে অ্যাকাউন্ট্যান্টরও কপালে ঘাম জমে যায়। বাড়ি, গাড়ি, বিদেশ সফর, পুরস্কার—সবই আছে। না থাকার কিছু নেই। অথচ কিছু একটা যেন নেই—এই কথাটাই বারবার মাথায় ঘোরে।
আজ রবিবার। অর্জুন বসে আছেন নিজের বিশাল বাগানে। কফির কাপ হাতে, চোখ কিন্তু দূরের আকাশে। হঠাৎই মনে পড়ে গেল ২২ বছর আগের এক বিকেলের কথা—যখন স্ত্রী শালিনী বলেছিল, “তুমি জিতছো ঠিকই, কিন্তু আমি প্রতিদিন তোমায় একটু একটু করে হারাচ্ছি।”
শালিনী চলে গেছে বছর সাতেক হলো। হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে নিঃশব্দে। শেষদিকে অর্জুন অফিসেই বেশি সময় কাটাতেন, হাসপাতালেও যেতেন নিয়মমতো, কিন্তু ‘সময়’ শব্দটার প্রকৃত অর্থ বুঝে উঠতে পারেননি। তখন তিনি সফলতার পেছনে ছুটছিলেন।
একটা পায়রা হঠাৎই জানালার রেলিংয়ে এসে বসে। অর্জুনের মন যেন চমকে ওঠে। হঠাৎই প্রশ্নটা নিজেকে করে ফেলেন—সফলতা মানেই কি শান্তি?
ছোটবেলায় গ্রামে দাদুর বাড়িতে গিয়ে কাটানো দিনগুলোর কথা মনে পড়ে যায়। তখন গরিব ছিল, কিন্তু মনটা ছিল হালকা। বিকেলে পুকুরে স্নান, বৃষ্টির সময় মাটির গন্ধ, ঠাকুমার কাছে শোনা গল্প—সেসব ছিল অমূল্য। সেখানে টাকা ছিল না, কিন্তু শান্তি ছিল উপচে পড়া।
একদিন এক পুরনো বন্ধুর সঙ্গে দেখা হয়েছিল কলেজ রিইউনিয়নে। সে এখন স্কুলশিক্ষক, ছোট একটা ফ্ল্যাটে থাকে, ছেলেমেয়েকে নিজে পড়ায়, মাসে চারটা বই পড়ে। সে বলেছিল, “তুই অনেক বড় হয়েছিস, কিন্তু তোকে খুব ক্লান্ত লাগে অর্জুন। আমি ছোট থাকলেও ভেতরটা শান্ত।”
সেই কথা তখন গুরুত্ব না পেলেও আজ যেন খোঁচা দেয়।
অর্জুনের ছেলে এখন আমেরিকায়, মেয়েও চাকরিসূত্রে বেঙ্গালুরুতে। কারোর সঙ্গেই খুব একটা কথা হয় না। হোয়াটসঅ্যাপে মাঝে মাঝে “Hi Dad” অথবা “Miss you too”। অর্জুনের ১২টা ঘর, ৪টা গাড়ি, কিন্তু দুপুরবেলায় খাওয়ার সময় টেবিলটা একা।
আজ এই রবিবারেই হঠাৎ এক অদ্ভুত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন। পুরনো ডায়েরি থেকে দাদুর ঠিকানা খুঁজে বের করলেন। সিদ্ধান্ত—সপ্তাহে অন্তত তিনদিন সেখানে যাবেন। বাকি সময় বই পড়বেন, গাছপালার যত্ন নেবেন, আর নিজের মধ্যে শান্তি খুঁজে নেবেন।
সন্ধ্যায় অর্জুন নিজের ছেলেকে ফোন করে বললেন, “রোহন, তোদের অনেক কিছু দিতে পেরেছি, কিন্তু একটা কথা আজ বুঝলাম—সফলতা মানেই শান্তি নয়। শান্তি আসে ভিতর থেকে, যা আমি এতদিন খুঁজিনি। এখন খুঁজতে চাই।”
ফোনের ওপাশে নীরবতা, তারপর রোহনের শান্ত গলা—“আমি তোমার জন্য গর্বিত, বাবা। এবার নিজেকে ভালোবাসো।”
চোখের কোণ ভিজে আসে অর্জুনের। একটা দমকা হাওয়া আসে, যেন বহুদিন পরে কেউ তাকে জড়িয়ে ধরল।
সেই মুহূর্তে তিনি বুঝতে পারেন—সফলতা একধরনের বাহ্যিক প্রাপ্তি, কিন্তু শান্তি হল আত্মার গভীর উপলব্ধি। আর সেই উপলব্ধির শুরু আজ, এই শান্ত রবিবার বিকেলে।
সমাপ্ত

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন