স্মৃতি হলো এমন এক জাদুর বাক্স, যা কখনও কখনও গানের সুরে খুলে যায়। কিছু মানুষ হারিয়ে যায় ঠিকই, কিন্তু কিছু সুর তাদের আবারও জীবনের একই মোহনায় ফিরিয়ে আনে। দীর্ঘ পনেরো বছরের ব্যবধান, একাকীত্ব আর একগুচ্ছ পুরোনো গানের প্রেক্ষাপটে এক অদ্ভুত পুনর্মিলনের গল্প— 'স্মৃতির রেডিও'।
চৈতি একদিন হঠাৎ এসে বলল, “তুই জানিস, এখনো আমি ঘুমোতে যাওয়ার আগে ‘চাঁদনি রাত’ শুনি?”
অর্ক হেসে বলেছিল, “তা শুনিস ভালো কথা, কিন্তু ওই গানে তোর ঘুম আসে কী করে? আমি শুনলেই পুরোনো জিনিসগুলো মনে পড়ে যায়, ঘুম তো পালায় বরং!”
চৈতির চোখে ছিল হালকা অভিমান।
“সেই যে কলেজের দিনগুলো… তোর বাইকের পেছনে বসে আমরা কোথায় কোথায় যে ঘুরতাম… ওই গানটা বাজলেই মনে হয়, আবার ফিরে যাচ্ছি…”
অর্ক একটু চুপ করে যায়।
এত বছর পরেও চৈতির চোখে অতটুকু জল জমলে, সে বুঝে যায়—সব কিছুই পুরোনো হয়, শুধু কিছু অনুভবের তারিখ মুছে যায় না।
২০১০ সালের দুর্গাপুজো।
অর্ক তখন সেকেন্ড ইয়ার। কলেজ ক্যান্টিনে প্রথম চৈতির সঙ্গে দেখা। চোখে বড় ফ্রেমের চশমা, হাতে ছোট্ট একটা নোটবুক—অদ্ভুত এক মিশেল ছিল সেই মেয়েটার মধ্যে, পড়ুয়া আর দুষ্টুমির।
“তুই রবীন্দ্রসংগীত শুনিস?”—চৈতির এই প্রশ্নেই বন্ধুত্বের শুরু।
“রবীন্দ্রসংগীত আর ফজর আলি, দুটোই শুনি”—অর্কর জবাবে চৈতি হেসে উঠেছিল, আর সেই হাসি অর্কর মনে গেঁথে যায়।
কতদিন পার হয়ে গেল।
বন্ধুত্ব থেকে প্রেম, প্রেম থেকে দূরত্ব, আর দূরত্ব থেকে দীর্ঘশ্বাস।
২০২৫ সালের জুলাই।
অর্ক এখন ক্যালকাটা হাই কোর্টে কাজ করে।
জীবন সোজা রেখে মাথা নিচু করে চলা, ব্যস্ততার পর্দায় পুরোনো স্মৃতিগুলো ধুলো জমে আছে।
হঠাৎ একদিন ইনস্টাগ্রামে ইনবক্সে একটা মেসেজ—
চৈতি: “এই গানটা শুনছিলাম, হঠাৎ তুই মনে পড়লি।”
সাথে ইউটিউব লিংক— "তোমায় হৃদ মাঝারে রাখবো..."
অর্কর চোখ আটকে যায় স্ক্রিনে।
পুরোনো গান, পুরোনো মানুষ, আবারও জীবনের দরজায় কড়া নাড়ে।
সে লিখে—
অর্ক: “ভুলে গিয়েছিলাম, গানগুলো এমন করে মনে পড়াবে তো ভাবিনি।”
চৈতি: “আমি ভুলিনি, শুধু হারিয়েছিলাম... তোকে, সেই গানগুলোকে, আমাদের ছোট ছোট বিকেলগুলোকে…”
তারপর?
হ্যাঁ, ওরা আবার দেখা করেছিল।
একটা পুরোনো ক্যাফেতে, যেটা এখন অনেক ঝকঝকে।
চৈতি এসেছিল লাল টিপ পরে, অর্কর প্রিয় রঙে সাজা।
চুপচাপ বসে ছিল ওরা কিছুক্ষণ।
চৈতি বলল, “তুই জানিস, কোনো গান নতুন হয় না। শুধু শুনে ফেলার পর মানুষ বদলে যায়। তখন গানটা নতুনভাবে বাজে... আবারও।”
অর্কর মনে পড়ে যায় সেই সন্ধ্যাগুলো, যখন বাইকে ঘুরতে ঘুরতে ‘তোমার হোল শুরু, আমার হোল সারা’ বাজত।
চৈতির চোখে জল টলমল করে ওঠে,
“তুই এখনো গান শুনিস?”
অর্ক হেসে বলে, “না, তবে আজ থেকে আবার শুনব… যদি তুই পাশে থাকিস।”
চৈতির উত্তর ছিল না।
শুধু একটা হাত ধীরে করে অর্কর হাতের ওপর রাখে।
মোবাইলে বাজতে থাকে পুরোনো গান।
আর দুইটা মানুষ, বহুদিন পর, আবার নতুন করে গান শোনে… একসাথে।
সমাপ্ত

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন