সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

স্মৃতির রেডিও — সৈকত প্রসাদ রায়

 

স্মৃতি হলো এমন এক জাদুর বাক্স, যা কখনও কখনও গানের সুরে খুলে যায়। কিছু মানুষ হারিয়ে যায় ঠিকই, কিন্তু কিছু সুর তাদের আবারও জীবনের একই মোহনায় ফিরিয়ে আনে। দীর্ঘ পনেরো বছরের ব্যবধান, একাকীত্ব আর একগুচ্ছ পুরোনো গানের প্রেক্ষাপটে এক অদ্ভুত পুনর্মিলনের গল্প— 'স্মৃতির রেডিও'




saikatprosadray


চৈতি একদিন হঠাৎ এসে বলল, “তুই জানিস, এখনো আমি ঘুমোতে যাওয়ার আগে ‘চাঁদনি রাত’ শুনি?”
অর্ক হেসে বলেছিল, “তা শুনিস ভালো কথা, কিন্তু ওই গানে তোর ঘুম আসে কী করে? আমি শুনলেই পুরোনো জিনিসগুলো মনে পড়ে যায়, ঘুম তো পালায় বরং!”

চৈতির চোখে ছিল হালকা অভিমান।
“সেই যে কলেজের দিনগুলো… তোর বাইকের পেছনে বসে আমরা কোথায় কোথায় যে ঘুরতাম… ওই গানটা বাজলেই মনে হয়, আবার ফিরে যাচ্ছি…”

অর্ক একটু চুপ করে যায়।
এত বছর পরেও চৈতির চোখে অতটুকু জল জমলে, সে বুঝে যায়—সব কিছুই পুরোনো হয়, শুধু কিছু অনুভবের তারিখ মুছে যায় না।

২০১০ সালের দুর্গাপুজো।
অর্ক তখন সেকেন্ড ইয়ার। কলেজ ক্যান্টিনে প্রথম চৈতির সঙ্গে দেখা। চোখে বড় ফ্রেমের চশমা, হাতে ছোট্ট একটা নোটবুক—অদ্ভুত এক মিশেল ছিল সেই মেয়েটার মধ্যে, পড়ুয়া আর দুষ্টুমির।

“তুই রবীন্দ্রসংগীত শুনিস?”—চৈতির এই প্রশ্নেই বন্ধুত্বের শুরু।
“রবীন্দ্রসংগীত আর ফজর আলি, দুটোই শুনি”—অর্কর জবাবে চৈতি হেসে উঠেছিল, আর সেই হাসি অর্কর মনে গেঁথে যায়।

কতদিন পার হয়ে গেল।
বন্ধুত্ব থেকে প্রেম, প্রেম থেকে দূরত্ব, আর দূরত্ব থেকে দীর্ঘশ্বাস।

২০২৫ সালের জুলাই।
অর্ক এখন ক্যালকাটা হাই কোর্টে কাজ করে।
জীবন সোজা রেখে মাথা নিচু করে চলা, ব্যস্ততার পর্দায় পুরোনো স্মৃতিগুলো ধুলো জমে আছে।

হঠাৎ একদিন ইনস্টাগ্রামে ইনবক্সে একটা মেসেজ—
চৈতি: “এই গানটা শুনছিলাম, হঠাৎ তুই মনে পড়লি।”
সাথে ইউটিউব লিংক— "তোমায় হৃদ মাঝারে রাখবো..."

অর্কর চোখ আটকে যায় স্ক্রিনে।
পুরোনো গান, পুরোনো মানুষ, আবারও জীবনের দরজায় কড়া নাড়ে।

সে লিখে—
অর্ক: “ভুলে গিয়েছিলাম, গানগুলো এমন করে মনে পড়াবে তো ভাবিনি।”
চৈতি: “আমি ভুলিনি, শুধু হারিয়েছিলাম... তোকে, সেই গানগুলোকে, আমাদের ছোট ছোট বিকেলগুলোকে…”

তারপর?
হ্যাঁ, ওরা আবার দেখা করেছিল।
একটা পুরোনো ক্যাফেতে, যেটা এখন অনেক ঝকঝকে।
চৈতি এসেছিল লাল টিপ পরে, অর্কর প্রিয় রঙে সাজা।

চুপচাপ বসে ছিল ওরা কিছুক্ষণ।
চৈতি বলল, “তুই জানিস, কোনো গান নতুন হয় না। শুধু শুনে ফেলার পর মানুষ বদলে যায়। তখন গানটা নতুনভাবে বাজে... আবারও।”

অর্কর মনে পড়ে যায় সেই সন্ধ্যাগুলো, যখন বাইকে ঘুরতে ঘুরতে ‘তোমার হোল শুরু, আমার হোল সারা’ বাজত।

চৈতির চোখে জল টলমল করে ওঠে,
“তুই এখনো গান শুনিস?”
অর্ক হেসে বলে, “না, তবে আজ থেকে আবার শুনব… যদি তুই পাশে থাকিস।”

চৈতির উত্তর ছিল না।
শুধু একটা হাত ধীরে করে অর্কর হাতের ওপর রাখে।
মোবাইলে বাজতে থাকে পুরোনো গান।
আর দুইটা মানুষ, বহুদিন পর, আবার নতুন করে গান শোনে… একসাথে।

                                                                       সমাপ্ত





মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বিদায় বেলার ফুটবল: এক টুকরো হাহাকার ও বন্ধুত্বের গল্প

 জীবন আসলে এক বহমান নদী, যেখানে প্রতিটি বাঁকে আমাদের কিছু পুরনো অভ্যাস আর প্রিয় মানুষকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যেতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই চারটে বছর—যাকে আমরা একসময় ফুরিয়ে যাবে না বলে ভাবতাম—আজ তার সমাবর্তন শেষে বিদায় জানানোর লগ্ন। রাতুল আর সায়নের সেই শেষ বিকেলের হোস্টেল রুমের নিঃশব্দ মুহূর্তগুলো কি কেবলই বিচ্ছেদ? নাকি এক পুরনো তালি দেওয়া ফুটবলের আবরণে ধরা থাকা একগুচ্ছ অমূল্য স্মৃতি? আমার লেখা অনুগল্প 'বিদায় বেলার ফুটবল' সম্প্রতি 'অনুগল্পের আসর' -এ পাঠ করা হয়েছে। রানাঘাট থেকে আকাশবাণী পর্যন্ত আমার এই ছোটগল্পের যাত্রার সেই বিশেষ মুহূর্তটি আপনাদের সাথে ভাগ করে নিচ্ছি। নিচে দেওয়া ভিডিওতে শুনুন সেই আবেগের প্রতিধ্বনি। গল্পটি লিখতে গিয়ে আমি অনুভব করেছি যে, প্রকৃত বন্ধুত্ব কখনও দূরত্বে হার মেনে যায় না। এমনকি ধর্মের কোনো দেয়াল বা ভৌগোলিক সীমানাও সেই টানকে ম্লান করতে পারে না। আশা করি, আপনাদেরও এই গল্পটি নিজেদের কোনো প্রিয় বন্ধুর কথা মনে করিয়ে দেবে। #MiniStory, #BengaliLiterature, #Anugalpa, #Ranaghat, #FMGold  , #Bondhutto #সৈকত প্রসাদ রায় অনুগল্প #বিদায় বেলার ফুটবল ছোটগল্প #রাত...

বিশ্বজননী সারদা মা: শ্রীমা সারদা দেবীকে নিবেদিত একটি ভক্তিপূর্ণ কবিতা

 " অঙ্কুর পত্রিকার ২৫তম সংখ্যায় প্রকাশিত আমার নতুন কবিতা 'বিশ্বজননী' । নারী শক্তির আধার এবং পরম করুণাময়ী শ্রী শ্রী সারদা মা-এর উদ্দেশ্যে আমার এই বিনম্র নিবেদন। জয়রামবাটীর পুণ্যভূমি থেকে শুরু করে আজ প্রতিটি ভক্তের হৃদয়ে মা বিচরণ করছেন শান্তি ও ক্ষমার রূপ ধরে। বছরের শুরুতে মায়ের আশীর্বাদ চেয়ে লেখা এই কবিতাটি আপনাদের কেমন লাগলো তা কমেন্ট করে জানাবেন। মায়ের চরণে আমাদের সকলের প্রণাম। জয় মা সারদা!" Kobitar Naam: Bishwojanani (বিশ্বজননী) Lekhok: Saikat Prasad Roy (সৈকত প্রসাদ রায়) Potrika: Ankur Patrika (অঙ্কর পত্রিকা) Bishoy: Sarada Ma-er Bhaktigiti o Kobita. #SaradaMa  #SriMaSaradaDevi  #BhaktiPoetry  #BengaliPoem  #AnkurPatrika  #বিশ্বজননী  #সৈকত_প্রসাদ_রায়  #সারদামা  #বাংলা_কবিতা #ভক্তিগীতি

যেখানে শান্তি থাকে (জীবনমুখী ছোটগল্প) | কলমে: সৈকত প্রসাদ রায়

   "সফলতা একধরনের বাহ্যিক প্রাপ্তি, কিন্তু শান্তি হল আত্মার গভীর উপলব্ধি।" বিশাল অট্টালিকা, দামী গাড়ি আর বিদেশের সফর—অর্জুন দত্তর জীবনে কমতি ছিল না কিছুর। তবুও ছাপ্পান্নো বছর বয়সে এসে কেন তাঁর মনে হলো, সাফল্যের ভিড়ে আসল শান্তিটা হারিয়ে গেছে? সাফল্যের চাকচিক্য ছেড়ে শেকড়ের টানে ফিরে যাওয়ার এক অনন্য গল্প: "যেখানে শান্তি থাকে" । আমার ব্লগে গল্পটি প্রকাশিত হয়েছে। পড়ার আমন্ত্রণ রইল। কলমে: সৈকত প্রসাদ রায়। #যেখানে_শান্তি_থাকে #সৈকত_প্রসাদ_রায় #বাংলা_গল্প #জীবনবোধ #শান্তি #BengaliLiterature ✍️ সৈকত প্রসাদ রায় জীবনের সবচেয়ে উঁচু দালানটা শেষমেশ দাঁড়িয়ে থাকলেও, তার ছায়ায় পড়ে থাকা নীরবতা অনেক সময়ই কেউ দেখে না। অর্জুন দত্তর বয়স এখন ছাপ্পান্নো। শহরের সবচেয়ে নামী কনস্ট্রাকশন কোম্পানির মালিক, টাকার হিসেব রাখতে গিয়ে অ্যাকাউন্ট্যান্টরও কপালে ঘাম জমে যায়। বাড়ি, গাড়ি, বিদেশ সফর, পুরস্কার—সবই আছে। না থাকার কিছু নেই। অথচ কিছু একটা যেন নেই—এই কথাটাই বারবার মাথায় ঘোরে। আজ রবিবার। অর্জুন বসে আছেন নিজের বিশাল বাগানে। কফির কাপ হাতে, চোখ কিন্তু দূরের আকাশে। হঠাৎই মনে পড়ে গেল ২২...