সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

যে প্রেম বলা হয় না (একটি প্রেমের গল্প) | কলমে: সৈকত প্রসাদ রায়

 

"তুই আমাকে ভালোবাসিস, এটা জেনেও আমি খুশি। কিন্তু ভালোবাসার প্রথম শর্ত হলো—ঠিক সময়ে তাকে চিনতে পারা। তুই চিনতে দেরি করেছিস।"

বন্ধুত্ব যখন প্রেমের চেয়েও গভীর হয়ে ওঠে, তখন তাকে চিনে নিতে ভুল করলে জীবন বদলে যায় চিরতরে। সৈকত আর নবনীতার সেই অপ্রাপ্তির গল্প: "যে প্রেম বলা হয় না"

পড়ুন আমার ব্লগে: কলমে: সৈকত প্রসাদ রায়।

#সৈকত_প্রসাদ_রায় #যে_প্রেম_বলা_হয়_না #বাংলা_গল্প #না_বলা_কথা #ছোটগল্প #BengaliWriter


সৈকত প্রসাদ রায়


লেখক: সৈকত প্রসাদ রায়

প্রথম পরিচয়


কলকাতার এক হালকা শীতের সকালে, মির্জা গালিব স্ট্রিটের এক ক্যাফেতে একে অপরের সামনে প্রথম বসেছিল সৈকত আর নবনীতা। দুইজনের পরিচয় ফেসবুকের এক বইপ্রেমীদের গ্রুপে—তর্ক হচ্ছিল 'গোরা' নাকি 'শেষের কবিতা' ভালো, সেই তর্কের সূত্র ধরেই এক বিকেলে অফলাইনে দেখা।

সৈকত—একজন তিরিশোর্ধ্ব সফল ব্যবসায়ী, আইটি ফার্মের মালিক, গড়পড়তা বাঙালি ছেলেদের চেয়ে একটু বেশিই গোছানো, সময়নিষ্ঠ, নিজস্ব এক নীতি অনুযায়ী জীবন কাটায়।

নবনীতা—স্টেট ব্যাংকে কর্মরত, শান্ত, স্থিরচরিত্র, তবু মাঝে মাঝে সে যেন এক বুক গভীর সমুদ্র, যেখানে ঢেউ উঠলেও সেটা বোঝা যায় না বাইরে থেকে।

প্রথম দেখাতেই একটা আলাদা টান তৈরি হয়েছিল, যদিও তারা কেউই সেদিন সেটা স্বীকার করেনি।

বন্ধুত্বের গভীরতা


দিন কেটে গেল, মাস কেটে গেল, বন্ধুত্ব জমে উঠলো। প্রতিদিন না হলেও অন্তত দু-তিন দিন পরপর একসাথে কফি, বই, সিনেমা, জীবন নিয়ে আলোচনা চলতে থাকলো। নবনীতার ব্যাঙ্কিং লাইফের চাপ আর সৈকতের কর্পোরেট স্ট্র্যাটেজির গল্পের মাঝে একটা ভারসাম্য তৈরি হলো।

নবনীতা প্রায়ই বলত—


"ভালো বন্ধু পাওয়া এই জীবনে সত্যিই বড় পাওয়া। তুই না থাকলে মাঝে মাঝে যেন দম বন্ধ হয়ে আসত রে।"

সৈকত হাসত, বলত—


"বন্ধু! হ্যাঁ, তাই-ই তো…"

কিন্তু সৈকতের ভিতরে একটা অদ্ভুত কাঁপন জমে উঠছিল—এটা কি কেবল বন্ধুত্ব? নাকি আরও কিছু?

প্রেমের ধাক্কা


একদিন, এক সন্ধ্যায় নবনীতা সৈকতের অফিসে গিয়েছিল একটা সামান্য ব্যাপার নিয়ে। তখন সৈকতের অফিসে নতুন এক মেয়ে জয়শ্রী এসেছে মার্কেটিং হেড হিসেবে। অনেকটা স্মার্ট, খোলামেলা, প্রগতিশীল। জয়শ্রী এসে নবনীতাকে দেখে একটু অবজ্ঞার ভঙ্গিতে বলেছিল—

"ওহ, ইউ আর দ্য ফ্রেন্ড? নট দ্য গার্লফ্রেন্ড?"

নবনীতা একটু হেসে বলেছিল—"বন্ধুই তো সবকিছু নয়?"

কিন্তু সেই রাতে নবনীতা সৈকতের কাছে জিজ্ঞেস করেছিল—


"তুই কি কখনোই ভাবিসনি… আমরা একটু অন্যরকম কিছু হতে পারি?"

সৈকত চুপ করে ছিল অনেকক্ষণ। বলেছিল—


"ভেবেছি, কিন্তু বন্ধুত্বের জায়গাটা এত সুন্দর, ওটা নষ্ট করার সাহস পাইনি।"

নবনীতা বলেছিল—


"তাহলে ঠিক আছে। বন্ধুত্বই থাক।"

কিন্তু এরপর সেই বন্ধুত্বেও কেমন যেন ফাটল ধরতে লাগল।

দূরত্ব


পরবর্তী কয়েক মাসে তারা দেখা করত কম, কথা বলত আরও কম। সৈকত নিজেকে বিজি রাখত, জয়শ্রীর সঙ্গে আরও বেশি সময় কাটাতে শুরু করেছিল, যেন নিজেকে ভুলে থাকার একটা উপায়।

নবনীতা ধীরে ধীরে নিজেকে গুটিয়ে ফেলেছিল। নিজের ব্যাংকের কাজ আর মাস্টার্সের পড়ায় নিজেকে ডুবিয়ে রেখেছিল।

একদিন ফেসবুকে নবনীতার ছবি দেখল সৈকত—দীপাবলির সন্ধ্যায়, কারোর সঙ্গে ঘুরতে গিয়েছে, হাসছে। সৈকতের মনে হল, তার বুকের ভেতর কেউ খোঁচা মারছে।

তারপর আরেকদিন খবর পেল—নবনীতা বিয়ের পাকা কথা বলছে এক ডিফেন্স অফিসারের সঙ্গে, নাম অর্ক। শান্ত, স্থির, রেসপেক্টফুল।

সৈকত বুঝতে পারল—সে যা হারিয়েছে, সেটা বন্ধুত্ব না, সেটা ছিল এমন কিছু যা প্রেমেরও চেয়ে গভীর।

স্বীকারোক্তি


এক সন্ধ্যায়, একেবারে হঠাৎ করে সৈকত নবনীতাকে ফোন করল।

"দুপুরে একবার দেখা করবি?"

নবনীতা বলল—"তুই তো আজকাল খুব ব্যস্ত। এখন মনে পড়ল?"

"আজ একটু জরুরি," সৈকতের কণ্ঠে একটা কাঁপা ছিল।

কফিশপে দেখা। সৈকত মুখ তুলে বলল—

"তোকে আমি বন্ধুর চোখে দেখেছি ঠিকই, কিন্তু আজ বুঝতে পারছি, সেটা বন্ধুত্বের বাইরেও কিছু ছিল। তোকে ছাড়া আমার দিনগুলো অসম্পূর্ণ। তুই চাইলে আমি সবকিছু থেকে পিছিয়ে আসতে রাজি আছি—শুধু বল, তুই এখনো…"

নবনীতা অনেকক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল—

"তুই আমাকে ভালোবাসিস, এটা জেনেও আমি খুশি। কিন্তু ভালোবাসার প্রথম শর্ত হলো—ঠিক সময়ে তাকে চিনতে পারা। তুই চিনতে দেরি করেছিস। এখন আমি ঠিক করেছি। তবে, তুই যদি সত্যিই আমাকে ভালোবাসিস, তা হলে আমাকে থামাবি না।"

সৈকতের চোখে জল জমে উঠল। নবনীতা টিস্যু এগিয়ে দিল।

"এটাও প্রেম," নবনীতা বলল, "তবে পরিণতির নয়, উপলব্ধির।"

শেষ প্রহর


কয়েক বছর পর, এক বইমেলায় হঠাৎ দেখা। নবনীতা অর্কের সঙ্গে এসেছে, একটা ছোট্ট ছেলেও আছে তাদের সঙ্গে। সৈকত তখনও অবিবাহিত। নিজের প্রকাশনা সংস্থা খুলেছে—বই নিয়ে কাজ করছে।

চোখাচোখি হলো। দুজনেই একটু থমকে দাঁড়াল। নবনীতা হেসে বলল—


"তুই এখনো সেই আগের মতোই, বই নিয়ে ডুবে থাকা।"

সৈকত বলল—"তুইও তো ঠিক আগের মতো, শুধু একটু পরিণত।"

একটা মুহূর্ত নীরবতা। তারপর নবনীতার ছেলেটা এসে সৈকতের হাত ধরে বলল—"তুমি কি আমার মায়ের পুরোনো বন্ধু?"

সৈকতের গলা ভারী হয়ে এল। সে মাথা নেড়ে বলল—

"হ্যাঁ রে, ওর সবচেয়ে ভালো বন্ধু।"

শেষ কথা

বন্ধুত্ব আর প্রেম—এই দুই অনুভবের মাঝখানে একটা সূক্ষ্ম সীমারেখা থাকে। কেউ সেটা লঙ্ঘন করে সুখী হয়, কেউ লঙ্ঘন না করেও। সৈকত আর নবনীতার গল্প সেই নীরব ভালোবাসার, যা কখনো বলা হয় না, কিন্তু আজীবন থেকে যায়।

                                                                                সমাপ্ত 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বিদায় বেলার ফুটবল: এক টুকরো হাহাকার ও বন্ধুত্বের গল্প

 জীবন আসলে এক বহমান নদী, যেখানে প্রতিটি বাঁকে আমাদের কিছু পুরনো অভ্যাস আর প্রিয় মানুষকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যেতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই চারটে বছর—যাকে আমরা একসময় ফুরিয়ে যাবে না বলে ভাবতাম—আজ তার সমাবর্তন শেষে বিদায় জানানোর লগ্ন। রাতুল আর সায়নের সেই শেষ বিকেলের হোস্টেল রুমের নিঃশব্দ মুহূর্তগুলো কি কেবলই বিচ্ছেদ? নাকি এক পুরনো তালি দেওয়া ফুটবলের আবরণে ধরা থাকা একগুচ্ছ অমূল্য স্মৃতি? আমার লেখা অনুগল্প 'বিদায় বেলার ফুটবল' সম্প্রতি 'অনুগল্পের আসর' -এ পাঠ করা হয়েছে। রানাঘাট থেকে আকাশবাণী পর্যন্ত আমার এই ছোটগল্পের যাত্রার সেই বিশেষ মুহূর্তটি আপনাদের সাথে ভাগ করে নিচ্ছি। নিচে দেওয়া ভিডিওতে শুনুন সেই আবেগের প্রতিধ্বনি। গল্পটি লিখতে গিয়ে আমি অনুভব করেছি যে, প্রকৃত বন্ধুত্ব কখনও দূরত্বে হার মেনে যায় না। এমনকি ধর্মের কোনো দেয়াল বা ভৌগোলিক সীমানাও সেই টানকে ম্লান করতে পারে না। আশা করি, আপনাদেরও এই গল্পটি নিজেদের কোনো প্রিয় বন্ধুর কথা মনে করিয়ে দেবে। #MiniStory, #BengaliLiterature, #Anugalpa, #Ranaghat, #FMGold  , #Bondhutto #সৈকত প্রসাদ রায় অনুগল্প #বিদায় বেলার ফুটবল ছোটগল্প #রাত...

বিশ্বজননী সারদা মা: শ্রীমা সারদা দেবীকে নিবেদিত একটি ভক্তিপূর্ণ কবিতা

 " অঙ্কুর পত্রিকার ২৫তম সংখ্যায় প্রকাশিত আমার নতুন কবিতা 'বিশ্বজননী' । নারী শক্তির আধার এবং পরম করুণাময়ী শ্রী শ্রী সারদা মা-এর উদ্দেশ্যে আমার এই বিনম্র নিবেদন। জয়রামবাটীর পুণ্যভূমি থেকে শুরু করে আজ প্রতিটি ভক্তের হৃদয়ে মা বিচরণ করছেন শান্তি ও ক্ষমার রূপ ধরে। বছরের শুরুতে মায়ের আশীর্বাদ চেয়ে লেখা এই কবিতাটি আপনাদের কেমন লাগলো তা কমেন্ট করে জানাবেন। মায়ের চরণে আমাদের সকলের প্রণাম। জয় মা সারদা!" Kobitar Naam: Bishwojanani (বিশ্বজননী) Lekhok: Saikat Prasad Roy (সৈকত প্রসাদ রায়) Potrika: Ankur Patrika (অঙ্কর পত্রিকা) Bishoy: Sarada Ma-er Bhaktigiti o Kobita. #SaradaMa  #SriMaSaradaDevi  #BhaktiPoetry  #BengaliPoem  #AnkurPatrika  #বিশ্বজননী  #সৈকত_প্রসাদ_রায়  #সারদামা  #বাংলা_কবিতা #ভক্তিগীতি

যেখানে শান্তি থাকে (জীবনমুখী ছোটগল্প) | কলমে: সৈকত প্রসাদ রায়

   "সফলতা একধরনের বাহ্যিক প্রাপ্তি, কিন্তু শান্তি হল আত্মার গভীর উপলব্ধি।" বিশাল অট্টালিকা, দামী গাড়ি আর বিদেশের সফর—অর্জুন দত্তর জীবনে কমতি ছিল না কিছুর। তবুও ছাপ্পান্নো বছর বয়সে এসে কেন তাঁর মনে হলো, সাফল্যের ভিড়ে আসল শান্তিটা হারিয়ে গেছে? সাফল্যের চাকচিক্য ছেড়ে শেকড়ের টানে ফিরে যাওয়ার এক অনন্য গল্প: "যেখানে শান্তি থাকে" । আমার ব্লগে গল্পটি প্রকাশিত হয়েছে। পড়ার আমন্ত্রণ রইল। কলমে: সৈকত প্রসাদ রায়। #যেখানে_শান্তি_থাকে #সৈকত_প্রসাদ_রায় #বাংলা_গল্প #জীবনবোধ #শান্তি #BengaliLiterature ✍️ সৈকত প্রসাদ রায় জীবনের সবচেয়ে উঁচু দালানটা শেষমেশ দাঁড়িয়ে থাকলেও, তার ছায়ায় পড়ে থাকা নীরবতা অনেক সময়ই কেউ দেখে না। অর্জুন দত্তর বয়স এখন ছাপ্পান্নো। শহরের সবচেয়ে নামী কনস্ট্রাকশন কোম্পানির মালিক, টাকার হিসেব রাখতে গিয়ে অ্যাকাউন্ট্যান্টরও কপালে ঘাম জমে যায়। বাড়ি, গাড়ি, বিদেশ সফর, পুরস্কার—সবই আছে। না থাকার কিছু নেই। অথচ কিছু একটা যেন নেই—এই কথাটাই বারবার মাথায় ঘোরে। আজ রবিবার। অর্জুন বসে আছেন নিজের বিশাল বাগানে। কফির কাপ হাতে, চোখ কিন্তু দূরের আকাশে। হঠাৎই মনে পড়ে গেল ২২...