সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

ছোট মা — সৈকত প্রসাদ রায়

 

Saikat Prosad Ray


ছোট মা

 সৈকত প্রসাদ রায়

বিকেলের দিকে ব্যস্ত শহরের ফুটপাতটা ছিল ভীষণ ভিড়ভাট্টায় ভরা। গাড়ির হর্ন, রিকশাওয়ালাদের চিৎকার, দোকানের ভিড়—সমস্ত মিলিয়ে চারপাশ কানে তালা লাগিয়ে দেওয়ার মতো। সেই ভিড়ের ভেতরেই দাঁড়িয়ে ছিল এক গরিব মা; পুরনো ছেঁড়া শাড়ি পরে, কোলে তার তিন বছরের ছোট ছেলে।

মায়ের চোখে জল, মুখে আতঙ্ক। সে এক হাতে ছেলেটিকে আঁকড়ে ধরেছে, আর অন্য হাতে ডাক্তারখানার চেম্বারের দরজার ফ্রেম চেপে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। ডাক্তার বেরিয়ে এসে শান্তভাবে বললেন, — “ওর রোগটি মারাত্মক কিছু নয়, কিন্তু অপারেশনটা করাতে হবে। খরচ কমপক্ষে চল্লিশ হাজার টাকা।”

মা যেন কেঁপে উঠল। তার গলায় আটকে থাকা কান্না আর লজ্জা একসাথে ফেটে বেরোল, — “ডাক্তারবাবু, এত টাকা আমার কাছে কোথায় পাব? দিন আনি দিন খাই। আমার ছেলেটাকে বাঁচান।”

ডাক্তার মুখ ঘুরিয়ে ভেতরে চলে গেলেন। মা ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। ছোট ছেলে অচেতন প্রায়, তবু মাঝে মাঝে খকখক করে কাঁপছে। সেই কান্নার আর্তনাদ আছড়ে পড়ল রাস্তার হইচইয়ের মধ্যে।

ঠিক তখনই রাস্তার ওপার দিয়ে যাচ্ছিল একদল বৃহন্নলা। রঙিন শাড়ি, হাতে তালি, ঠোঁটে লিপস্টিক—তাদের দেখে মানুষ অনেক সময় চোখ নামিয়ে নেয়, ভয় পায় বা বিরক্ত হয়। তারা অনেকে আবার জোর করেও টাকা তোলে, এটাই সমাজের চোখে তাদের পরিচয়।

কিন্তু সেদিনের করুণ দৃশ্য তাদের থামিয়ে দিল। দলের নেত্রী লাবনী দূর থেকেই সেই মায়ের কান্না শুনে থমকে দাঁড়াল। চোখ সরু করে দেখল, একটা মায়ের কষ্টে বুক ফেটে যাচ্ছে, ছেলেকে বাঁচাতে সে অসহায় হয়ে দাঁড়িয়ে। লাবনী ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল। মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে বলল, — “কী হলো বউদি?”

মা কান্নাসড়সড় কণ্ঠে সব খুলে বলল। লাবনী আর কিছু বলল না। সে চুপচাপ নিজের ব্যাগ খুলে ভেতরে দিনের উপার্জিত টাকার নোট, কিছু খুচরো—সব বের করে মায়ের হাতে তুলে দিল। দলের অন্যরাও অবাক হয়ে একে একে নিজেদের টাকা বের করে দিল। সেই টাকাগুলো একসাথে জমা হলো, আর মুহূর্তেই সেই অপারেশনের খরচের জোগান হয়ে গেল।

মা প্রথমে বিশ্বাস করতে পারছিল না। তার হাত কাঁপছিল, সে ভয়ে ভয়ে বলল, — “তোমরা? তোমাদের এত কষ্টের উপার্জন...?”

লাবনী শুধু হেসে বলল, — “আমাদের বাচ্চা হলে আমরা মায়ের মতোই বুকে চেপে রাখতাম। তোমার ছেলে এখন থেকে আমাদেরও ছেলে।”

সেদিন সেই অচেনা বৃহন্নলার দলটি যেন নিঃশব্দে ছেলেটির “ছোট মা” হয়ে উঠল। তারা হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে থাকল অনেকক্ষণ। মা যখন ভেতরে গিয়ে ভর্তি করাচ্ছিল, তারা বাইরে বসে প্রার্থনা করছিল নিজেদের মতো করে।

কেউ তাদের নাম লেখেনি, কেউ ধন্যবাদ দিতে যায়নি। পরের দিন আবার তারা রাস্তায় বেরিয়েছে, হয়তো কারও কাছে টাকা চাইতে গিয়ে গালিও খেয়েছে। কিন্তু অন্তরে তারা জানে—একটা ছোট প্রাণকে তারা বাঁচিয়েছে।

মায়ের চোখে সেই দিন থেকে বৃহন্নলাদের পরিচয় বদলে গেল। সে বুঝল, সমাজ যাদের কেবল ভয় বা ঘৃণার চোখে দেখে, তাদের বুকের ভেতরেও আছে মহাসাগরের মতো মমতা।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বিদায় বেলার ফুটবল: এক টুকরো হাহাকার ও বন্ধুত্বের গল্প

 জীবন আসলে এক বহমান নদী, যেখানে প্রতিটি বাঁকে আমাদের কিছু পুরনো অভ্যাস আর প্রিয় মানুষকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যেতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই চারটে বছর—যাকে আমরা একসময় ফুরিয়ে যাবে না বলে ভাবতাম—আজ তার সমাবর্তন শেষে বিদায় জানানোর লগ্ন। রাতুল আর সায়নের সেই শেষ বিকেলের হোস্টেল রুমের নিঃশব্দ মুহূর্তগুলো কি কেবলই বিচ্ছেদ? নাকি এক পুরনো তালি দেওয়া ফুটবলের আবরণে ধরা থাকা একগুচ্ছ অমূল্য স্মৃতি? আমার লেখা অনুগল্প 'বিদায় বেলার ফুটবল' সম্প্রতি 'অনুগল্পের আসর' -এ পাঠ করা হয়েছে। রানাঘাট থেকে আকাশবাণী পর্যন্ত আমার এই ছোটগল্পের যাত্রার সেই বিশেষ মুহূর্তটি আপনাদের সাথে ভাগ করে নিচ্ছি। নিচে দেওয়া ভিডিওতে শুনুন সেই আবেগের প্রতিধ্বনি। গল্পটি লিখতে গিয়ে আমি অনুভব করেছি যে, প্রকৃত বন্ধুত্ব কখনও দূরত্বে হার মেনে যায় না। এমনকি ধর্মের কোনো দেয়াল বা ভৌগোলিক সীমানাও সেই টানকে ম্লান করতে পারে না। আশা করি, আপনাদেরও এই গল্পটি নিজেদের কোনো প্রিয় বন্ধুর কথা মনে করিয়ে দেবে। #MiniStory, #BengaliLiterature, #Anugalpa, #Ranaghat, #FMGold  , #Bondhutto #সৈকত প্রসাদ রায় অনুগল্প #বিদায় বেলার ফুটবল ছোটগল্প #রাত...

বিশ্বজননী সারদা মা: শ্রীমা সারদা দেবীকে নিবেদিত একটি ভক্তিপূর্ণ কবিতা

 " অঙ্কুর পত্রিকার ২৫তম সংখ্যায় প্রকাশিত আমার নতুন কবিতা 'বিশ্বজননী' । নারী শক্তির আধার এবং পরম করুণাময়ী শ্রী শ্রী সারদা মা-এর উদ্দেশ্যে আমার এই বিনম্র নিবেদন। জয়রামবাটীর পুণ্যভূমি থেকে শুরু করে আজ প্রতিটি ভক্তের হৃদয়ে মা বিচরণ করছেন শান্তি ও ক্ষমার রূপ ধরে। বছরের শুরুতে মায়ের আশীর্বাদ চেয়ে লেখা এই কবিতাটি আপনাদের কেমন লাগলো তা কমেন্ট করে জানাবেন। মায়ের চরণে আমাদের সকলের প্রণাম। জয় মা সারদা!" Kobitar Naam: Bishwojanani (বিশ্বজননী) Lekhok: Saikat Prasad Roy (সৈকত প্রসাদ রায়) Potrika: Ankur Patrika (অঙ্কর পত্রিকা) Bishoy: Sarada Ma-er Bhaktigiti o Kobita. #SaradaMa  #SriMaSaradaDevi  #BhaktiPoetry  #BengaliPoem  #AnkurPatrika  #বিশ্বজননী  #সৈকত_প্রসাদ_রায়  #সারদামা  #বাংলা_কবিতা #ভক্তিগীতি

যেখানে শান্তি থাকে (জীবনমুখী ছোটগল্প) | কলমে: সৈকত প্রসাদ রায়

   "সফলতা একধরনের বাহ্যিক প্রাপ্তি, কিন্তু শান্তি হল আত্মার গভীর উপলব্ধি।" বিশাল অট্টালিকা, দামী গাড়ি আর বিদেশের সফর—অর্জুন দত্তর জীবনে কমতি ছিল না কিছুর। তবুও ছাপ্পান্নো বছর বয়সে এসে কেন তাঁর মনে হলো, সাফল্যের ভিড়ে আসল শান্তিটা হারিয়ে গেছে? সাফল্যের চাকচিক্য ছেড়ে শেকড়ের টানে ফিরে যাওয়ার এক অনন্য গল্প: "যেখানে শান্তি থাকে" । আমার ব্লগে গল্পটি প্রকাশিত হয়েছে। পড়ার আমন্ত্রণ রইল। কলমে: সৈকত প্রসাদ রায়। #যেখানে_শান্তি_থাকে #সৈকত_প্রসাদ_রায় #বাংলা_গল্প #জীবনবোধ #শান্তি #BengaliLiterature ✍️ সৈকত প্রসাদ রায় জীবনের সবচেয়ে উঁচু দালানটা শেষমেশ দাঁড়িয়ে থাকলেও, তার ছায়ায় পড়ে থাকা নীরবতা অনেক সময়ই কেউ দেখে না। অর্জুন দত্তর বয়স এখন ছাপ্পান্নো। শহরের সবচেয়ে নামী কনস্ট্রাকশন কোম্পানির মালিক, টাকার হিসেব রাখতে গিয়ে অ্যাকাউন্ট্যান্টরও কপালে ঘাম জমে যায়। বাড়ি, গাড়ি, বিদেশ সফর, পুরস্কার—সবই আছে। না থাকার কিছু নেই। অথচ কিছু একটা যেন নেই—এই কথাটাই বারবার মাথায় ঘোরে। আজ রবিবার। অর্জুন বসে আছেন নিজের বিশাল বাগানে। কফির কাপ হাতে, চোখ কিন্তু দূরের আকাশে। হঠাৎই মনে পড়ে গেল ২২...