চাঁদের আলোয় ফিরে আসা
সৈকত প্রসাদ রায়
রাত তখন ন’টা পেরিয়েছে। আকাশে একফালি চাঁদ উঠেছে, নদীর জলে তার আলো টলমল করছে। বৃষ্টির পরের সন্ধ্যা — বাতাসে মাটির গন্ধ, চারদিকে অদ্ভুত শান্তি। দূরে বাঁশঝাড়ের ফাঁক দিয়ে মাঝে মাঝে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যায়। এমন রাতে একা বসে নদীর ধারে থাকা মানে, নিজের ভেতরের কোলাহলটাকে একটু শোনা।
রূপা সেই কাজটাই করছিল। হাতে একটা পুরনো চিঠি, চোখে অচেনা আলো। চিঠিটা সে পড়েছে কতবার, গুনে শেষ করতে পারে না। তবু আজ আবার খুলে পড়ছে। কাগজটা হলুদ হয়ে গেছে, কালির দাগ হালকা, কিন্তু অক্ষরগুলো এখনো বেঁচে আছে— “আমি ফিরব একদিন, চাঁদের আলোয়, ঠিক তোমার জানলার সামনে দাঁড়িয়ে।”
রূপার বুক কেঁপে ওঠে। এই কথাগুলো লিখেছিল সৌম্য। দশ বছর আগে।
তখন রূপা কলেজে পড়ে, সৌম্য তার ব্যাচমেট। ছেলেটা চুপচাপ, কিন্তু চোখে ছিল স্বপ্নের ঝিলিক। সাহিত্যপাগল সৌম্য গল্প লিখত, কবিতা লিখত, আর বলত, “চাঁদের আলোয় সব সত্যি হয়ে যায়, রূপা।চাঁদ মিথ্যা লুকোতে জানে না।” রূপা হাসত, “তুমি ঠিক পাগল হয়ে যাবে কোনোদিন।”
কিন্তু পাগল তো হল না, চলে গেল। বিদেশে পড়তে গিয়ে দুর্ঘটনায় হারিয়ে গেল সব খবর। কারো সঙ্গে যোগাযোগ রইল না। রূপা প্রথমে ভেবেছিল ফিরবে, পরে অপেক্ষা করেছিল, তারপর ধীরে ধীরে নিজেকে বোঝাতে শিখেছিল — “সবাই তো ফেরে না।”
তবু সে আজও প্রতিমাসের পূর্ণিমায় নদীর ধারে আসে। হয়তো কোনো অলৌকিক টান, হয়তো চাঁদের আলোয় সেই মুখটা এখনো দেখতে পায় সে।
আজও এসেছে।
চাঁদ উঠে গেছে, নদীর জলে আলো ছড়িয়ে পড়ছে। রূপা চোখ বন্ধ করে মনে মনে বলল —
“তুমি যদি থাকো কোথাও, এই আলোটা তোমায় ছুঁয়ে যাক।”
ঠিক তখনই পেছন থেকে এক কণ্ঠস্বর — “তুমি এখনো চাঁদের সঙ্গে কথা বলো, রূপা?”
রূপা ঘুরে তাকাল। হৃদয় থমকে গেল। সামনে দাঁড়িয়ে সৌম্য! একটু বয়সের ছাপ, চোখের তলায় ক্লান্তি, কিন্তু সেই চেনা হাসি, সেই গলার স্বর।
রূপা অবিশ্বাসে বলে উঠল, “তুমি? এ কী করে সম্ভব?”
সৌম্য চুপ করে নদীর দিকে তাকাল, “আমি ফিরেছি… একটু দেরি করে। দুর্ঘটনায় বেঁচে গেছিলাম, কিন্তু স্মৃতি হারিয়ে ফেলেছিলাম। বছর দুই আগেই সব মনে পড়েছে। ফিরে আসার সাহস পাইনি… আজ পেলাম।”
রূপা কিছু বলতে পারল না। কেবল বুকের ভেতরটা গরম হয়ে উঠল। এত বছর পর, যে মানুষটাকে সে কল্পনায় ধরে রেখেছিল, সে আজ সত্যি দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে।
দু’জনেই চুপ। চাঁদের আলো তাদের মুখে পড়ছে, নদী যেন সেই নীরবতাকে আশ্রয় দিচ্ছে।
সৌম্য বলল, “তুমি বদলাওনি কিছুই। এখনো চুলগুলো এভাবেই রাখো।”
রূপা হেসে ফেলল, “তুমি তো সব মনে রেখেছ।”
“মনে না রাখলে বাঁচতাম কীভাবে?”
চাঁদ যেন একটু উজ্জ্বল হয়ে উঠল। রূপা হঠাৎ বলল, “তুমি জানো, আমি ভাবতাম তুমি ফিরবে না। তারপরও প্রতি পূর্ণিমায় এখানে আসতাম।”
সৌম্য তাকিয়ে রইল তার চোখে, “আমি জানি। আমারও মনে হতো, কোনো এক জায়গায় কেউ অপেক্ষা করছে। তাই ফিরলাম। আমি চেয়েছিলাম এই আলোয় তোমায় আবার দেখতে।”
দু’জনেই একসঙ্গে নদীর দিকে তাকাল।
“চাঁদের আলোয় সব সত্যি হয়ে যায়”— সৌম্যের সেই পুরনো কথা হঠাৎ বাস্তব হয়ে উঠল।
রূপা শান্ত স্বরে বলল, “তুমি কি এবার থাকবে?”
সৌম্য মাথা নাড়ল, “থাকব। তবে আগের মতো নয়। অনেক কিছু বদলে গেছে, রূপা। আমি আর আগের সৌম্য নই।”
রূপা মৃদু হেসে বলল, “তাতে কী? চাঁদও তো প্রতিরাতে এক নয়। তবু আলো তো দেয়।”
এক মুহূর্তে সবকিছু নিঃশব্দ। বাতাস বয়ে গেল তাদের চুল ছুঁয়ে। রূপা অনুভব করল— এতদিনের একাকিত্ব যেন গলে যাচ্ছে চাঁদের আলোয়।
সৌম্য পকেট থেকে একটা ছোট্ট ডায়েরি বের করল। “এটা তোমার জন্য। দুর্ঘটনার আগে আমি প্রতিদিন তোমার জন্য কিছু লিখতাম। বেঁচে ফিরে ওগুলোই খুঁজে পেয়েছিলাম।”
চোখ ভিজে উঠল রূপার। তার মনে হল, চাঁদের আলো আর নদীর জলে মিলেমিশে যেন একটিই আলো— প্রেমের, বেঁচে থাকার, ফিরে পাওয়ার।
সৌম্য ধীরে বলল, “রূপা, তুমি যদি এখনও চাও, আমি থাকতে চাই। নতুন করে শুরু করতে চাই। কোনো প্রতিশ্রুতি নয়, শুধু একটু সময়।”
রূপা চুপ করে মাথা নিচু করল। তারপর ধীরে তার হাতটা বাড়িয়ে বলল, “চলো, এই আলোয় হাঁটি একটু।”
দু’জন পাশাপাশি হাঁটতে লাগল নদীর ধারে। চাঁদ উপরে উঠে গেছে, জোৎস্না ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। যেন প্রকৃতি নিজেই বলছে— কিছু প্রেমের গল্প শেষ হয় না, শুধু অপেক্ষা করে সঠিক রাতের, সঠিক চাঁদের আলোয় আবার জন্ম নেবার।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন