সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

তুমি শুনতে পাওনি — সৈকত প্রসাদ রায়

 

 "আমার নীরবতাও অনেক কিছু বলতে চেয়েছিল, তুমি শুনতে পাওনি, আমি বলতে পারিনি।"

মাঝে মাঝে দূরত্ব তৈরি হয় শব্দের অভাবে নয়, বরং শব্দের ভার সইতে না পেরে। রিমি আর অর্ণবের তিন বছরের সেই দীর্ঘ নীরবতা কি একখানা চিরকুটে মিটে যায়? নাকি কিছু নীরবতা চিরকালই সত্যি হয়ে থেকে যায়?

আমার নতুন ছোটগল্প: "তুমি শুনতে পাওনি"

গল্পটি পড়ুন আর আপনার অনুভূতি কমেন্টে জানান। কলমে: সৈকত প্রসাদ রায়। #তুমি_শুনতে_পাওনি #বাংলা_গল্প #সৈকত_প্রসাদ_রায় #ShortStory #BengaliLiterature


সৈকত প্রসাদ রায়



লেখক: সৈকত প্রসাদ রায়

বৃষ্টি তখন ধীরে ধীরে পড়ছে। জানালার কাঁচে টুপটাপ শব্দ। যেন কাঁদতে কাঁদতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে আকাশও। রিমি বিছানার কোণায় চুপচাপ বসে আছে। পাশে একটা মগ, তাতে ঠান্ডা হয়ে যাওয়া কফি। ল্যাম্পের আলোয় তার মুখটা যেন কেমন নিস্তেজ, বিষণ্ণ। শব্দ নেই, কথা নেই, শুধু নিঃশ্বাসের একটানা চলাফেরা।

সেদিনটা ঠিক এমনই একটা সন্ধে ছিল।


তিন বছর আগে, এই ঘরেই...

রিমি আর অর্ণব – নামদুটো তখন যেন একে অপরের সমার্থক। কলেজে পড়ার সময় থেকেই ওদের বন্ধুত্ব, পরে প্রেম, আর তারপর একসঙ্গে থাকা শুরু। কলকাতার এই ছোট্ট ফ্ল্যাটটাই তাদের একান্ত পৃথিবী হয়ে উঠেছিল। প্রতিদিন সকালে একসঙ্গে উঠে চা বানানো, বই নিয়ে ঝগড়া করা, সন্ধেবেলায় একসঙ্গে ছাদে হেঁটে আসা – ছোট ছোট মুহূর্তগুলোর মধ্যেই ওদের জীবন ছিল।

কিন্তু ভালোবাসা সবসময় একইভাবে থাকে না।


তাও সব প্রেমে ঝড় আসে না, কিছু প্রেম শুধু চুপচাপ বদলে যায়।

অর্ণব প্রথমে একটু বেশি চুপচাপ হয়ে পড়েছিল। অফিস থেকে ফিরে আর কথা বলত না বেশি, ফোনে মনোযোগ, হোয়াটসঅ্যাপে হাসি, অথচ রিমির দিকে তাকিয়ে যেন সব শব্দ শুকিয়ে যেত। রিমি প্রথমে বুঝতে পারেনি, ভেবেছিল কাজের চাপ। তারপর একটা সন্ধে...

রিমি বলেছিল,


— “অর্ণব, আজ তোমার চোখে যেন খুব দূরত্ব। কাকে দেখছ তুমি?”


অর্ণব শুধু তাকিয়ে ছিল, বলেছিল না কিছু।


চুপচাপ জামাটা পাল্টে বাথরুমে চলে গিয়েছিল।

সেই দিন থেকে শুরু।


প্রতিদিন একটু করে দূরত্ব।


প্রতিদিন একটু করে নীরবতা।

রিমি চিৎকার করেনি, ঝগড়া করেনি। শুধু একদিন একখানা চিঠি লিখে রেখেছিল অর্ণবের বালিশের নিচে।

**“তুমি এখন আর আমার চোখে তাকাও না।


আমার রান্নায় তোমার মন নেই।


তুমি হাসো, কিন্তু সেটা আমাকে নিয়ে নয়।

জানি, তুমি কিছু বলবে না।


তুমি যাওয়ার আগে শুধু একবার আমার দিকে তাকিও।


দেখবে, আমার নীরবতাও অনেক কিছু বলছে।


শুধু তুমি শোনার চেষ্টা করো না।”**

সেই চিঠিটা পড়ার পরের দিন অর্ণব চলে গিয়েছিল।


কোনো শব্দ ছাড়াই।


রিমি শুধু ঘরের দরজার শব্দ শুনেছিল। তারপর আর কিছুই না।

আজ তিন বছর পর সেই ঘর, সেই বিছানা, সেই জানালা, শুধু অর্ণব নেই।

রিমি এখন সাংবাদিক, একটা ছোট নিউজ পোর্টালে কাজ করে। মানুষকে নিয়ে লিখে, কষ্ট নিয়ে, ভালোবাসা নিয়ে, আর সবচেয়ে বেশি — নীরবতা নিয়ে।

কারণ ও জানে, নীরবতা অনেক কিছু বলে যায়।

একদিন অফিস থেকে ফিরে চিঠির বাক্সে একটা খাম পেল।


হাতের লেখা অচেনা, কিন্তু ঠিকানা ঠিক।

ভেতরে ছোট্ট একটা চিরকুট—

“আমার নীরবতাও অনেক কিছু বলতে চেয়েছিল,


তুমি শুনতে পাওনি, আমি বলতে পারিনি।

তুমি যদি এখনও কফির কাপে গন্ধ খোঁজো,


তবে জানিও – আমি এখনো সেই গন্ধে বেঁচে আছি।

— অর্ণব”

রিমি এক মুহূর্ত চুপ করে থাকল। তারপর জানালার কাঁচে মাথা ঠেকিয়ে বলল নিচু গলায়—

“এই নীরবতাই তো আমাদের একমাত্র সত্যি কথা।”

বাইরে বৃষ্টি পড়ছিল, ভেতরে আরেকরকম নীরবতা।


যেখানে কথা নেই, অভিযোগ নেই – শুধু একরাশ না বলা অনুভূতি,


যা শব্দে নয়, শুধুই বোঝায়।

আর তাই – নীরবতা অনেক কিছু বলে যায়।

                                                                         সমাপ্ত


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বিদায় বেলার ফুটবল: এক টুকরো হাহাকার ও বন্ধুত্বের গল্প

 জীবন আসলে এক বহমান নদী, যেখানে প্রতিটি বাঁকে আমাদের কিছু পুরনো অভ্যাস আর প্রিয় মানুষকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যেতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই চারটে বছর—যাকে আমরা একসময় ফুরিয়ে যাবে না বলে ভাবতাম—আজ তার সমাবর্তন শেষে বিদায় জানানোর লগ্ন। রাতুল আর সায়নের সেই শেষ বিকেলের হোস্টেল রুমের নিঃশব্দ মুহূর্তগুলো কি কেবলই বিচ্ছেদ? নাকি এক পুরনো তালি দেওয়া ফুটবলের আবরণে ধরা থাকা একগুচ্ছ অমূল্য স্মৃতি? আমার লেখা অনুগল্প 'বিদায় বেলার ফুটবল' সম্প্রতি 'অনুগল্পের আসর' -এ পাঠ করা হয়েছে। রানাঘাট থেকে আকাশবাণী পর্যন্ত আমার এই ছোটগল্পের যাত্রার সেই বিশেষ মুহূর্তটি আপনাদের সাথে ভাগ করে নিচ্ছি। নিচে দেওয়া ভিডিওতে শুনুন সেই আবেগের প্রতিধ্বনি। গল্পটি লিখতে গিয়ে আমি অনুভব করেছি যে, প্রকৃত বন্ধুত্ব কখনও দূরত্বে হার মেনে যায় না। এমনকি ধর্মের কোনো দেয়াল বা ভৌগোলিক সীমানাও সেই টানকে ম্লান করতে পারে না। আশা করি, আপনাদেরও এই গল্পটি নিজেদের কোনো প্রিয় বন্ধুর কথা মনে করিয়ে দেবে। #MiniStory, #BengaliLiterature, #Anugalpa, #Ranaghat, #FMGold  , #Bondhutto #সৈকত প্রসাদ রায় অনুগল্প #বিদায় বেলার ফুটবল ছোটগল্প #রাত...

বিশ্বজননী সারদা মা: শ্রীমা সারদা দেবীকে নিবেদিত একটি ভক্তিপূর্ণ কবিতা

 " অঙ্কুর পত্রিকার ২৫তম সংখ্যায় প্রকাশিত আমার নতুন কবিতা 'বিশ্বজননী' । নারী শক্তির আধার এবং পরম করুণাময়ী শ্রী শ্রী সারদা মা-এর উদ্দেশ্যে আমার এই বিনম্র নিবেদন। জয়রামবাটীর পুণ্যভূমি থেকে শুরু করে আজ প্রতিটি ভক্তের হৃদয়ে মা বিচরণ করছেন শান্তি ও ক্ষমার রূপ ধরে। বছরের শুরুতে মায়ের আশীর্বাদ চেয়ে লেখা এই কবিতাটি আপনাদের কেমন লাগলো তা কমেন্ট করে জানাবেন। মায়ের চরণে আমাদের সকলের প্রণাম। জয় মা সারদা!" Kobitar Naam: Bishwojanani (বিশ্বজননী) Lekhok: Saikat Prasad Roy (সৈকত প্রসাদ রায়) Potrika: Ankur Patrika (অঙ্কর পত্রিকা) Bishoy: Sarada Ma-er Bhaktigiti o Kobita. #SaradaMa  #SriMaSaradaDevi  #BhaktiPoetry  #BengaliPoem  #AnkurPatrika  #বিশ্বজননী  #সৈকত_প্রসাদ_রায়  #সারদামা  #বাংলা_কবিতা #ভক্তিগীতি

যেখানে শান্তি থাকে (জীবনমুখী ছোটগল্প) | কলমে: সৈকত প্রসাদ রায়

   "সফলতা একধরনের বাহ্যিক প্রাপ্তি, কিন্তু শান্তি হল আত্মার গভীর উপলব্ধি।" বিশাল অট্টালিকা, দামী গাড়ি আর বিদেশের সফর—অর্জুন দত্তর জীবনে কমতি ছিল না কিছুর। তবুও ছাপ্পান্নো বছর বয়সে এসে কেন তাঁর মনে হলো, সাফল্যের ভিড়ে আসল শান্তিটা হারিয়ে গেছে? সাফল্যের চাকচিক্য ছেড়ে শেকড়ের টানে ফিরে যাওয়ার এক অনন্য গল্প: "যেখানে শান্তি থাকে" । আমার ব্লগে গল্পটি প্রকাশিত হয়েছে। পড়ার আমন্ত্রণ রইল। কলমে: সৈকত প্রসাদ রায়। #যেখানে_শান্তি_থাকে #সৈকত_প্রসাদ_রায় #বাংলা_গল্প #জীবনবোধ #শান্তি #BengaliLiterature ✍️ সৈকত প্রসাদ রায় জীবনের সবচেয়ে উঁচু দালানটা শেষমেশ দাঁড়িয়ে থাকলেও, তার ছায়ায় পড়ে থাকা নীরবতা অনেক সময়ই কেউ দেখে না। অর্জুন দত্তর বয়স এখন ছাপ্পান্নো। শহরের সবচেয়ে নামী কনস্ট্রাকশন কোম্পানির মালিক, টাকার হিসেব রাখতে গিয়ে অ্যাকাউন্ট্যান্টরও কপালে ঘাম জমে যায়। বাড়ি, গাড়ি, বিদেশ সফর, পুরস্কার—সবই আছে। না থাকার কিছু নেই। অথচ কিছু একটা যেন নেই—এই কথাটাই বারবার মাথায় ঘোরে। আজ রবিবার। অর্জুন বসে আছেন নিজের বিশাল বাগানে। কফির কাপ হাতে, চোখ কিন্তু দূরের আকাশে। হঠাৎই মনে পড়ে গেল ২২...