সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

ভুল মানুষকে ভালোবেসেছিলাম: নিজেকে ফিরে পাওয়ার এক লড়াই | লেখক: সৈকত প্রসাদ রায়

ভুল মানুষকে ভালোবেসেছিলাম 

✍️ সৈকত প্রসাদ রায়

রিমঝিম বৃষ্টির দুপুর। জানলার পাশে বসে চায়ের কাপ হাতে আনমনা হয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে অরিত্রা। একটানা বৃষ্টি যেন ওর ভেতরের সিক্ত হাহাকারকেই প্রতিধ্বনি করছে। কতদিন হলো এইভাবে বসে থাকে সে, ঠিক কতদিন জানে না। সময় এখানে থেমে গেছে—একটা বিশেষ মুহূর্তে, এক বিশেষ মানুষের কাছে।

সেই মানুষটার নাম ছিল ঈশান।

বিশ্বাস, ভালোবাসা, স্বপ্ন—সবকিছু এক এক করে সাজিয়েছিল ওদের দুজনের গল্পে। আর সেই গল্পেই কোথাও একটা মোচড় ছিল, যেটা অরিত্রা প্রথমে বুঝতে পারেনি। ঈশান ছিল রোমান্টিক, যত্নশীল, হাসিখুশি—তবে সেই হাসির আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক অদ্ভুত আত্মকেন্দ্রিকতা।

অরিত্রা ধীরে ধীরে টের পেতে থাকে—এই সম্পর্কটা ওর একার হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ঈশানের ভালোবাসা ছিল শর্তসাপেক্ষ, সুবিধাভোগী। ওর চোখে অরিত্রা ছিল শুধু একজন 'ভালো শ্রোতা', একজন 'সহজ ভরসাস্থল'—কিন্তু একজন জীবনসঙ্গী নয়।

প্রথম দুঃখ এসেছিল যেদিন ঈশান ওর জন্মদিনে এসে বলেছিল,
"আজ একটু তাড়াতাড়ি বেরোতে হবে, দোস্তদের সঙ্গে পার্টি আছে।"
অরিত্রা কেকের পাশে বসে শুধু হাসি দিয়েছিল, গলার ভিতরে তখন আটকে ছিল কিছু শব্দ—ভাঙা স্বপ্নের মতো।

তারপর একে একে আরও ধাক্কা—ঈশানের কথায়, ব্যবহারেই বুঝতে পারত, অরিত্রা যেন কিছু একটা প্রমাণ করার জোরালো চেষ্টায় রয়েছে সবসময়। ঈশানের 'ভালোবাসা' পেতে গেলে ওকে চুপ থাকতে হতো, সমঝোতা করতে হতো, নিজের ভালো-মন্দ পছন্দ বিসর্জন দিতে হতো।

তবুও থেকেছিল অরিত্রা।
ভেবেছিল—ভুল বুঝছে, সময় বদলাবে, মানুষ বদলাবে।
কিন্তু একটা সময়ের পর চেনা মুখটা যেন ভিন হয়ে যায়। ঈশান স্পষ্ট বলেছিল,
"তুই অনেক বেশি ইমোশনাল রে, একটু কুল হতে শিখ। আমায় আটকাতে যাবি না, প্লিজ।"

সেদিন অরিত্রা হাঁটছিল একা শহরের রাস্তায়। চারদিকে ছিল লোকে লোকারণ্য, কিন্তু ওর ভেতরটা ফাঁকা, নিঃসঙ্গ। বারবার একটা প্রশ্ন ঘুরছিল মাথায়—
ভুল কি আমি করেছিলাম? এই মানুষটাকেই কেন ভালোবেসেছিলাম?

মনের ভেতর তীব্র টানাপোড়েন চলছিল। একদিকে ছিল ঈশানের প্রতি নরম একটা টান, অন্যদিকে ছিল নিজের অস্তিত্ব, আত্মসম্মান। আর তার মাঝখানে পড়ে ছিন্নভিন্ন হচ্ছিল ওর ভেতরের অরিত্রা।

দিনের পর দিন লড়েছে ও। নিজের মনকে বোঝাতে, নিজেকেই মেনে নিতে। কাউকে কিছু বলেনি, শুধু রাতে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চোখের দিকে তাকিয়ে বলেছে—
“তুই ভুল করেছিলি, ঠিক আছে। কিন্তু তুই বাঁচতে শিখিস, আবার নতুন করে ভালোবাসতে শিখিস, তবে এবার নিজেকেই আগে ভালোবাসিস।”

সে রাতে ফোনটা ব্লক করেছিল ঈশানের। পুরনো মেসেজ, ছবি সব মুছে ফেলেনি—রেখেছিল, স্মৃতি হিসেবে নয়, প্রমাণ হিসেবে। নিজের প্রতি প্রতিশ্রুতি দেওয়ার মতো—এবার আর না।

আজ তিন বছর পেরিয়ে গেছে।
অরিত্রা এখনো একা, তবে একাকী নয়। নিজেকে খুঁজে পেয়েছে নতুন করে। কলেজে পড়ায়, গান গায়, ছবি আঁকে, নিজের ছোট একটা বইও লিখেছে—“ভুল মানুষকে ভালোবেসেছিলাম”—যেখানে ওর যন্ত্রণাগুলোই ভাষা পেয়েছে।

জানালার বাইরে বৃষ্টি পড়ছে।
অরিত্রা আজ আর কাঁদে না।
সে জানে—ভুল করেছিল, তবে সেই ভুলটাই ওকে শিখিয়েছে কীভাবে নিজেকে ভালোবাসতে হয়।

        সমাপ্ত



মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বিদায় বেলার ফুটবল: এক টুকরো হাহাকার ও বন্ধুত্বের গল্প

 জীবন আসলে এক বহমান নদী, যেখানে প্রতিটি বাঁকে আমাদের কিছু পুরনো অভ্যাস আর প্রিয় মানুষকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যেতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই চারটে বছর—যাকে আমরা একসময় ফুরিয়ে যাবে না বলে ভাবতাম—আজ তার সমাবর্তন শেষে বিদায় জানানোর লগ্ন। রাতুল আর সায়নের সেই শেষ বিকেলের হোস্টেল রুমের নিঃশব্দ মুহূর্তগুলো কি কেবলই বিচ্ছেদ? নাকি এক পুরনো তালি দেওয়া ফুটবলের আবরণে ধরা থাকা একগুচ্ছ অমূল্য স্মৃতি? আমার লেখা অনুগল্প 'বিদায় বেলার ফুটবল' সম্প্রতি 'অনুগল্পের আসর' -এ পাঠ করা হয়েছে। রানাঘাট থেকে আকাশবাণী পর্যন্ত আমার এই ছোটগল্পের যাত্রার সেই বিশেষ মুহূর্তটি আপনাদের সাথে ভাগ করে নিচ্ছি। নিচে দেওয়া ভিডিওতে শুনুন সেই আবেগের প্রতিধ্বনি। গল্পটি লিখতে গিয়ে আমি অনুভব করেছি যে, প্রকৃত বন্ধুত্ব কখনও দূরত্বে হার মেনে যায় না। এমনকি ধর্মের কোনো দেয়াল বা ভৌগোলিক সীমানাও সেই টানকে ম্লান করতে পারে না। আশা করি, আপনাদেরও এই গল্পটি নিজেদের কোনো প্রিয় বন্ধুর কথা মনে করিয়ে দেবে। #MiniStory, #BengaliLiterature, #Anugalpa, #Ranaghat, #FMGold  , #Bondhutto #সৈকত প্রসাদ রায় অনুগল্প #বিদায় বেলার ফুটবল ছোটগল্প #রাত...

বিশ্বজননী সারদা মা: শ্রীমা সারদা দেবীকে নিবেদিত একটি ভক্তিপূর্ণ কবিতা

 " অঙ্কুর পত্রিকার ২৫তম সংখ্যায় প্রকাশিত আমার নতুন কবিতা 'বিশ্বজননী' । নারী শক্তির আধার এবং পরম করুণাময়ী শ্রী শ্রী সারদা মা-এর উদ্দেশ্যে আমার এই বিনম্র নিবেদন। জয়রামবাটীর পুণ্যভূমি থেকে শুরু করে আজ প্রতিটি ভক্তের হৃদয়ে মা বিচরণ করছেন শান্তি ও ক্ষমার রূপ ধরে। বছরের শুরুতে মায়ের আশীর্বাদ চেয়ে লেখা এই কবিতাটি আপনাদের কেমন লাগলো তা কমেন্ট করে জানাবেন। মায়ের চরণে আমাদের সকলের প্রণাম। জয় মা সারদা!" Kobitar Naam: Bishwojanani (বিশ্বজননী) Lekhok: Saikat Prasad Roy (সৈকত প্রসাদ রায়) Potrika: Ankur Patrika (অঙ্কর পত্রিকা) Bishoy: Sarada Ma-er Bhaktigiti o Kobita. #SaradaMa  #SriMaSaradaDevi  #BhaktiPoetry  #BengaliPoem  #AnkurPatrika  #বিশ্বজননী  #সৈকত_প্রসাদ_রায়  #সারদামা  #বাংলা_কবিতা #ভক্তিগীতি

যেখানে শান্তি থাকে (জীবনমুখী ছোটগল্প) | কলমে: সৈকত প্রসাদ রায়

   "সফলতা একধরনের বাহ্যিক প্রাপ্তি, কিন্তু শান্তি হল আত্মার গভীর উপলব্ধি।" বিশাল অট্টালিকা, দামী গাড়ি আর বিদেশের সফর—অর্জুন দত্তর জীবনে কমতি ছিল না কিছুর। তবুও ছাপ্পান্নো বছর বয়সে এসে কেন তাঁর মনে হলো, সাফল্যের ভিড়ে আসল শান্তিটা হারিয়ে গেছে? সাফল্যের চাকচিক্য ছেড়ে শেকড়ের টানে ফিরে যাওয়ার এক অনন্য গল্প: "যেখানে শান্তি থাকে" । আমার ব্লগে গল্পটি প্রকাশিত হয়েছে। পড়ার আমন্ত্রণ রইল। কলমে: সৈকত প্রসাদ রায়। #যেখানে_শান্তি_থাকে #সৈকত_প্রসাদ_রায় #বাংলা_গল্প #জীবনবোধ #শান্তি #BengaliLiterature ✍️ সৈকত প্রসাদ রায় জীবনের সবচেয়ে উঁচু দালানটা শেষমেশ দাঁড়িয়ে থাকলেও, তার ছায়ায় পড়ে থাকা নীরবতা অনেক সময়ই কেউ দেখে না। অর্জুন দত্তর বয়স এখন ছাপ্পান্নো। শহরের সবচেয়ে নামী কনস্ট্রাকশন কোম্পানির মালিক, টাকার হিসেব রাখতে গিয়ে অ্যাকাউন্ট্যান্টরও কপালে ঘাম জমে যায়। বাড়ি, গাড়ি, বিদেশ সফর, পুরস্কার—সবই আছে। না থাকার কিছু নেই। অথচ কিছু একটা যেন নেই—এই কথাটাই বারবার মাথায় ঘোরে। আজ রবিবার। অর্জুন বসে আছেন নিজের বিশাল বাগানে। কফির কাপ হাতে, চোখ কিন্তু দূরের আকাশে। হঠাৎই মনে পড়ে গেল ২২...